রিপন হোসেন সাজু যশোর ॥ করোনাভাইরাসের মধ্যে যশোর শহরে শারীরিক দূরত্ব বজায় ও ভিড় এড়াতে দোকানপাট খোলা ও ইজিবাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। গতকাল সার্কিট হাউজে ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি’র সভায় পণ্যভিত্তিক রোটেশন তৈরি করে সপ্তাহের ৬ দিনের পরিবর্তে ২ দিন দোকানপাট খুলে জনসমাগম এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থাৎ এক পণ্যের দোকান সপ্তাহে দুই দিন খোলার অনুমতি দিলে শহরে মানুষের ভিড় কমানো সম্ভব। একই সাথে ইজিবাইকগুলো দু’ভাগে বিভক্ত করে একদিন অন্তর একদিন চালানো বা তিন দিন; তিন দিন ভাগে ভাগ করে চালাচলের নিয়ম করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রূপরেখা তৈরি করার জন্য যশোর পৌরসভার মেয়র ও প্রেসক্লাব সভাপতিকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে, অভয়নগরের নওয়াপাড়া শহরসহ যেসব এলাকায় করোনা রোগী দ্রুত বাড়ছে, সেসব স্থান লকডাউন করা হবে।
জেলাজুড়ে বাইরে বেরুনো লোকজনকে মাস্ক ব্যবহারে বাধ্য করতে প্রশাসনিক তৎপরতা ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জোরদার করা হবে। ব্যাংক, পোস্ট অফিসসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়, দরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে সেবিষয়েও।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি’র সভাপতি ও যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘যশোর শহরের বাজার এলাকায় কোনোভাবেই মানুষের ভিড় কমানো যাচ্ছে না। সেই কারণে রোটেশনভিত্তিতে দোকানপাট খোলা রাখার কথা হয়েছে। ট্রায়াল বেসিসে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। এক্ষেত্রে পৌরসভার মেয়র ও প্রেসক্লাব সভাপতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি দাঁড় করাবেন।’
তিনি জানান, রাস্তায় ইজিবাইকের সংখ্যা ও যাত্রী কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি বাস্তবায়ন করবেন পৌরসভার মেয়র। এছাড়া অভয়নগরের নওয়াপাড়া পৌরসভাসহ উপজেলার কয়েকটি এলাকায় করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নওয়াপাড়া পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডসহ যেসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি, সেখানে লকডাউন করা হবে।
প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন সাংবাদিকদের বলেন, দোকানপাট খোলা থাকবে সপ্তাহের ছয়দিন। কিন্তু কোনো দোকান ছয়দিনই খোলা থাকবে না। এক্ষেত্রে পণ্যভিত্তিক রোটেশন তৈরি করা হবে। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো এই প্রস্তাব তৈরি করবে। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, ‘ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকে সপ্তাহের ছয়দিন।
বাজারে নানা ধরনের দোকানপাট আছে। এক্ষেত্রে পণ্যের ভিত্তিতে ক্যাটাগরি তৈরি করা হবে। এক ধরনের দোকান হয়তো সপ্তাহে দুইদিন করে খোলা থাকবে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কম্পিউটার বা ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান যদি শনি ও রোববার খোলা থাকে, পোশাকের দোকান হয়তো সোম ও মঙ্গলবার খোলা থাকবে। এভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। সভার এই সংক্রান্ত বিষয়াদি ইতিমধ্যে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে এটি কার্যকর করা হবে।
মেয়র আরও বলেন, ‘যশোর পৌরসভার তালিকাভুক্ত ইজিবাইক আছে প্রায় তিন হাজার। রেজিস্ট্রেশন নাম্বার অনুযায়ী প্রথম দেড় হাজার হয়তো আজ চললো। তাহলে দ্বিতীয় দেড় হাজার চলবে আগামীকাল।’ ইজিবাইকে এখন যেভাবে যাত্রী পরিবহন করা হয়, সেক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র। তিনি বলেন, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহায়তায় পৌরসভার কর্মীরা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। বিষয়টি জনসাধারণকে জানানোর জন্য শহরে মাইকিং করা হবে।
মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কীভাবে বাধ্য করা হবে জানতে চাইলে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন বলেন, শহরের মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করবেন। মানুষকে মাস্ক ব্যবহারে সচেতন করতে তারা কাজ করবেন। দরকার হলে আইনের প্রয়োগও করা হবে। ইজিবাইকে যাত্রী সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই যানবাহনে একসঙ্গে তিনজনের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না।
অভয়নগরে উদ্বেগজনক হারে করোনাভাইরাস রোগী বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সেখানকার সুনির্দিষ্ট এলাকায় কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করা হবে বলে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি দেখভাল করবেন। সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে
যশোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল নিয়ামুল, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) উপপরিচালক কবির আহম্মেদ, পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) প্রতিনিধি ডা. গোলাম মোর্তজা, ডা. মীর আবু মাউদ প্রমুখ।
এর আগে যশোর জেলাকে একদফা লকডাউন করা হয়েছিল।
পরে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রমজান মাসে দোকানপাট বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বাজারে মানুষের ব্যাপক সমাগম হওয়ায় ঈদের আগে নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয় অন্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।